রহস্য গল্পঃ কদমগাছের বাদুড়

In - Nov 9, 2017
এলাকাটিতে মানুষের চেয়ে মশার উপদ্রব বেশি। তবুও আপাতত এই এলাকায় কম ভাড়ায় পরিবার নিয়ে সচ্ছলভাবে থাকা যায়। মশা-মাছির সমস্যাটা এত বড় কোন সমস্যা নয়। কয়েল ধরালেই চলে। অবশ্য আজকাল কয়েলেও উপকার পাওয়া যায় না। কয়েলের ধোয়া শেষ হয়ে গেলেই কোথা থেকে আবার এই মশার আবির্ভাব হয়ে যায়। কয়েল ধরানোর আধা ঘন্টা জানালা খোলা থাকে তারপর লাগিয়ে দেয়া হয়। আলী আকবরের ধারণা– মশাগুলো ধোয়া সহ্য না করতে পেরে জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। আধা ঘন্টায় ঘরের মশা ভ্যানিস কিন্তু কয়েলের ধোয়া শেষ হয়ে গেলেও মশা শেষ হয় না। এটা কি কোন রহস্য। আজকাল আলী আকবরের রহস্যের প্রতি ঝোক বেশি। অফিসে বসে স্মার্টফোনে পিডিএফ ফাইলের অনেকে রহস্য বই পড়েন । তিনি ভাবছে গুলিস্তান থেকে ৬০ টাকা দিয়ে একটা লাইট কিনে আনবে। গুলিস্তানে ভ্যান গাড়ির উপর মাইকিং করে করে লাইট বিক্রি করছে। এই লাইট নাকি যতক্ষণ জ্বলবে ততক্ষণ ঘরে মশা, মাছি, ছাড়পোকা ইত্যাদি ক্ষতিকর কীট ঘরে আসতে পারে না। আসলেই সত্যি কিনা মিথ্যা যাচাইয়ের আগ্রহটা মোচন করতে হবে।
আলি আকবর আগে যাত্রাবাড়ী থাকতো। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ে অফিস সহায়ক পোষ্টে আছেন। বেতন দিয়ে চার সদস্যের সংসার চালাতে হিমসিম না হয়ে উপায় নেই। বেতনের টাকার সবচেয়ে বড় খরচটা হয় বাড়িভাড়ায় দিতে গিয়ে। তার অফিসের আরেকজন কর্মচারী বললো, মুগদায় নাকি খুব সস্তায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। যাত্রাবাড়ী থেকে মুগদা বেশি দূরে নয়, বাসে আসলে ৫ টাকা খরচ হয়। কিন্তু তিনি মুগদা ঘুরে এত সস্তায় বাসা পেলেন না, তাকে মুগদা দিয়ে আরো ভিতরে মান্ডা এলাকায় আসতে হলো। এখানে বাসা ভাড়াটা অনেক কম। অনেক টাকাই তার বেঁচে যাবে। এক সপ্তাহ হলো এই এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছে। এই এলাকার যে গলিতে তিনি থাকেন সেখানে একটা ময়লা খাল সোজা চলে গেছে বুড়িগঙ্গা। এই খালের উপরের ব্রিজ পার করেই প্রথম বিল্ডিং- এর নিচ তলায় তিনি থাকেন। নিচতলায় বাড়িওয়ালা একটা ছোট বারান্দা বানিয়েছেন। বারান্দা দিয়ে বাহিরের রাস্তায় মানুষের চলাচল। বারান্দার পাশেই ওয়াসরুম। ওয়াসরুমে যেতে হলে তাকে বারান্দা দিয়ে যেতে হবে। এই বারান্দা দিয়েই মশার বড় দলটা রুমে প্রবেশ করে। তবে এই বারান্দার সুবিধাও কম না। তিনি রাতে বসে বসে সিগারেট টানতে পারেন। ঘরে সিগারেট টানলে তার বউ ভাঙা রেডিও এর মতো আওয়াজ তুলেই যায়।
তিনি সিগারেট কিনে বারান্দায় এসে বসেছেন। লাইটারটা দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে একটা লম্বা টান দেয়ার পর একটা বাদুরকে তিনি লক্ষ্য করলেন। বাদুরটা এত নিচে এলোমেলোভাবে গতি হারিয়ে উড়ছে। রাতের বেলার এদের গতি হারানোর কোন কথাই নয়, বাদুরাতো দিনের বেলায় চোখে দেখে না, রাতেতো তাদের স্পষ্ট দেখার কথা। এটার সাইজ এতোটা বড় নয়। সম্ভবত বাচ্চা হবে। এই বাদুরটা রাত হলেই কোথা থেকে নিমে আসে কে জানে। আশেপাশেতো কোন গাছাগাছালির চিহ্ন নেই। হয়তো কোন বিল্ডিং এর ফাঁকে লুকিয়ে থাকে। এই বাদুরটা প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই ব্রিজের আশেপাশে এলোমেলো নিয়মে উড়ে। কেউ ব্রিজ দিয়ে হেঁটে ভিতরে আসতে গেলে মনে হবে এখনি বুঝি তার মাথারা সাথে আঘাত পাবে। প্রায় সময় আলী আকবর ব্রিজ দিয়ে হাঁটার সময় বাদুড়টা এমনভাবে উড়তে দেখতো তার মনে হতো এখনি তার মাথারর সাথে বাড়ি খাবে, তিনি মাথা নুইয়ে ফেলতেন। সিগারেটে বড় বড় টান দিয়ে এই বাদুড়ের উড়ন্ত দৌড় দেখছেন। তার মনে হচ্ছে এই বাদুড়টা পাগল হয়ে গেছে। এই পাগলা বাদুড় নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। তাকে হিসাব কষতে হবে, কি করে সংসারের খরচ আরো কমানো সম্ভব। কৃপণতা অবলম্বন না করলে ভবিশ্যত সুন্দর করা যাবে না। তিনি আরেকটা টান দিতেই তার ঠোঁট জ্বলে উঠলো। ঠোটে মনে হয় আগুন লেগে গেছে। সিগারেট অনেক আগেই শেষ হয়ে সিগারেটের ফ্লিটারে আগুন ধরেছে সেটা তিনি খেয়ালই করেননি, যার কারণে তামাকের ধোয়ার বদলে ফমের ধোয়ায় ঠোট জ্বলে গেছে। ঠোট ঘষতে ঘষতে তিনি রুমে গেলেন। তার মেয়ে তিন্নি নাক কুচকে বলে উঠলো, বাবা– সিগারেট খাওয়ার পর একটা সেন্টারফ্রুট খাবা, ইহ্ কি বিশ্রী গন্ধ! তিনি মেয়ের কাছে লজ্জিত হলেন। মাত্র ৮ বছরের মেয়েটা তার বাবাকে এভাবে লজ্জায় ফালাতে পারবে আলী আকবর তা ভাবতেও পারেনি। তিনি বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে মা। তোমার নতুন স্কুলে কেমন লাগছে? বাবা, এতোটা ভালো না। কেউ বন্ধু হতে চাচ্ছেই না। কত ভাবে ভাব নেয়ার জন্য চেষ্টা করলাম হলোই না।
হয়ে যাবে মা। নতুন নতুন তো, আর কয়েকদিন গেলে অনেল বন্ধু পাবে।
না বাবা, ওঁরা খুব জেদি।
সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।
তুমি খাবে না?
পরে খাবো। এখন একটু বই পড়বো
আলী আকবর বই নিয়ে বসেছেন। কিন্তু বার বার তার পড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। তিনি কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছেন না। পড়তে পড়তে তার মাথায় অন্য ভাবনার উদ্ভব হয়ে যায়। কখনো এই এলাকার খালটির চিন্তা চলে আসে, কখনো পাগল বাদুড়টার চিন্তা, কখনো আবার তার সাংসারিক খরচ কমানোর চিন্তা চলে আসে। তার ঘুমও আসছে না। তিনি স্মার্টফোনে ইউটিউবে কোয়ান্টাম মিকানিক্স, থিওরি অফ রিলেটেভিটি, ব্লাক হোল, ট্রাইম ট্রাভল ইত্যাদি বিজ্ঞান সম্পর্কিত ভিডিও দেখছেন। তার মনে হচ্ছে বিজ্ঞানে তার আগ্রহের কারণে শুধু মাত্র বিজ্ঞানে তিনি মনযোগ বসাতে পারছেন। তার ধারণা যদি সে কমার্সে না পড়ে সাইন্সে পড়তো তাহলে হয়তো বা কোন বিজ্ঞানী বা ইন্জিনিয়ার হতো। কিন্তু বাবা-মা অর্থের জন্য সাইন্সে পড়তে দেয়নি। তিনি খুব সিগারেটের তৃষ্ণা অনুভব করছেন। প্যাকেটে আরো ৪ টা সিগারেটের মতো আছে। রাতও বিশাল হয়েছে। এখনি সিগারেটটা খেয়ে ঘুমাতে হবে নয়তো সকালে অফিসের জন্য উঠা যাবে না।
সিগারেট আর লাইটার নিয়ে আলী আকবর বারান্দায় বসলেন। সিগারেটের প্রথম লম্বা টান তার মাথায় গিয়ে পৌছালো, মাথাটা ঝিম ঝিম করতে লাগলো। তারপরও তিনি টেনেই যাচ্ছে। হঠ্যাৎ বারান্দার বাইরে অতিরিক্ত চিকন কন্ঠে কেউ বলছে, সাহায্য কর, হেল্প! হেল্প! আলী আকবরের বুকের ভিতর ধপ! ধপ! ধপ! স্পন্দের আওয়াজ তিনি নিজেই শুনতে পারছেন। এতো রাতে প্রায়, তিনটার সময় কে বিপদে পড়েছে, কাকে আবার ডাকাতে ধরলো? তিনি বারান্দার গ্রিলের ফাঁকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে কাউকে দেখতে পারছেন না। কথাটা থেমে গেলো। তিনি আবার চেয়ারে বসে সিগারেট টানছেন। তার ধারণা হয়তো দূর থেকে কেউ বলছিলো, নয়তো মনের ভুল। মাথাটাওতো ঝিম ঝিম বাড়ছে। মনে হচ্ছে সিগারেটের বদলে তিনি গাজা খাচ্ছেন। আবারও সেই শব্দ—- সাহায্য কর, হেল্প! হেল্প! এইবার আর শব্দটা থামছে না। তিনি বলছেন, কে কে?
আমি?
আমি কে? কোথা থেকে বলছো? তোমাকে দেখতে পারছি না।
আমি এই যে, তোমার বারান্দার গ্রিলের পাশে। এই যে তোমার ডান হাতটার পাশে। কোথায়, তোমাকে দেখতে পারছি না। আর তোমার গলার স্বরটা এতো চিকন কেনো। অনেকটা রেডিও পোগ্রামের বাংলা টকিং টমের মতো, তার চেয়ে চিকন।
তুমি তোমার ফোনের ফ্লাশ লাইটা অন করে এদিকে দেখো।
আলী আকবর তার স্মার্টফোনের ফ্লাশ নেড়ে চেড়ে দেখতে গিয়ে তিনি যথেষ্ট ভয় পেলেন। শিয়ালের মতো মুখ, দাঁতগুলো রাক্ষসের মতো, কানগুলো খারা খারা। কুচকুচে কালোও না হালকা লালচে। আলী আকবর তার হাতের সিগারেটের প্যাকেটা দিয়ে বাদুড়টাকে ফেলে দিতে গেলে আবারও শব্দ শোনা গেলো– কি করছো? আমায় ফেলে দিও না। আমি উড়তে উড়তে ক্লান্ত।
আলী আকবরে বুকের স্পন্দন বাড়তে বাড়তে এমন মনে হলো তার শরীর বরফ হয়ে জমে যাচ্ছে। তিনি ছিটকে দূরে চলে এলেন। তিনি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন, পারছেন না। তার ধারণা, তার মাথা ঝিম ঝিম থেকে এমনটা হচ্ছে। তাকে তাড়াতাড়ি শুতে যেতে হবে। কিন্তু তিনি আবারও কথা শুনতে পারছেন– তুমি কি ভয় পাচ্ছো? প্লীজ ভয় পাবে না। আজ পর্যন্ত সবাই ভয় পেয়ে এই এলাকার অনেকেই বাসা ছেড়ে চলে গেছে। আমি থট রিডিং জানি। আমি জানি তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে।
এটা কিভাবে সম্ভব? আমার মাথায় একটু পানি দিয়ে আসছি।
ভয় পেয়ো না। মাথায় পানি ঢালার প্রয়োজন নেই। তুমি কি ভাবছো, অতিরিক্ত টেনশন বা মাথা ঝিম ধরার কারণে কিংবা বিনিদ্র থাকার জন্য তুমি বাদুড়ের মুখে মানুষের কথা শুনতে পারছো। আসলে আমি মানুষের মতো কথা বলতে পারি। শুধু তাই নয়, আমি মানুষের মাথায় কি চিন্তা চলছে সব জানি।
এটাও কি সম্ভব হতে পারে?
কতকিছুইতো আজকাল সম্ভব হয়। এই একবিংশ শতাব্দীতে সবই সম্ভব।
তুমি কিভাবে জানো এটা একবিংশ শতাব্দী?
আমার মা বলছে।
তোমার মাও কি মানুষের মতো কথা বলতে পারে?
না, আমার মা আমাদের ভাষায় বলেছে।
এটা সম্ভব না। আমার মনে হচ্ছে আমার মাথার তার ছিড়ে গেছে। আচ্ছা তুমিই সেই তার ছেড়া মানে পাগল বাদুড়টা না?
আমাকে পাগল বলো না প্লীজ। আমার মা-ও আমাকে পাগল বলতো। আমি যখন গাছে ঝুলে মানুষের মতো কথা বলতাম তখন আমার মাও আমাকে বলতো আমি নাকি পাগল। তুমি মনে হয় খুব বেশি ভয় পাচ্ছো। আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে টানতে টানতে আমার সাথে কথা বল দেখবে অনেকটা আড়ষ্টতা এবং ভয় চলে যাবে।
তারপর আলী আকবর হাত কাঁপাতে কাঁপাতে সিগারেটটা নিজের মুখে গুজে নিয়ে লাইটার দিয়ে ধরালেন। তারপর বললো, আচ্ছা। তুমি কিভাবে কথা বলছো? আমিতো কখনো শুনিনি বাদুড় কথা বলতে পারে।
তাও আবার এতো বিচক্ষণ বাদুড়।
তুমিতো অনেককিছুই জানো না। আচ্ছা তুমি কি জানো বাদুড় একমাত্র স্তনপায়ী প্রাণী যারা উড়তে পারে।
না- জানতাম না।
তুমি আরো অনেককিছুই জানো না। তুমি জানোও না বাদুড় কথা বলতে পারে। তুমি কি জানো এমন মানুষও আছে যারা বাদুড়ের মতো কথা বলতে পারে। তাহলে আমি বাদুড় হয়ে মানুষের মতো কথা বলছি এতে তুমি ভয় পাচ্ছো কেনো।
জানি না।
তোমার ভয় কেটে যাচ্ছে, তুমি আমায় বিশ্বাস করতে শুরু করছো।
না–
আমি প্রথমেই বলেছি আমি হিউম্যান থট জানি। তোমরা মানুষরা সহজেই বিশ্বাস করে ফেলো আবার সহজেই সন্দেহ করো।
হয়তো।
তোমার কি এখনো মনে হচ্ছে তুমি কল্পনায় বা ঘোরে আছো?
হুঁ।
শোন পৃথিবীতে বিজ্ঞানের ব্যাখার বাহিরে অনেক কিছুই আছে কিন্তু তারা এগুলো এখনো ব্যাখা করতে পারছে না। তোমার জন্য একটা পরিচিত উদাহরণ দিই। তুমি কয়েকদিন ধরে ভাবছো টাইম ট্রাভেল নিয়ে। ইউটিউব, গুগল হতে শুরু করে বইসহ পড়া শুরু করছো। তুমিই ভাবো এই তথ্যটা জানা পর্যন্ত কি তোমার মনে হয়েছিলো টাইম ট্রাভেল সম্ভব অর্থ্যাৎ অতীত বা ভবিশ্যতে যাওয়া সম্ভব? নিশ্চই না। কিন্তু তুমি যখন দেখলে, পড়লেন বা জানলে অতীতে বা ভবিশ্যতে যাওয়া সম্ভব শুধু মাত্র থিওরিক্যালি কিন্তু বাস্তবে এখনো নয় কারণ উন্নত প্রযুক্তি বা ইন্স্ট্রুমেন্ট এখনো আবিষ্কার হয়নি। হয়তো একদিন হয়ে যাবে। যখন টাইম ট্রাভেল বাস্তবে সম্ভব হবে তখন কি তোমার মনে হবে না– এও কি করে সম্ভব হলো? ব্যাপারটা এরকম। আজকে আমরা যাকে অতিপ্রাকৃত জানি কাল হয়তো এটার ব্যাখা চলে আসবে। আমি কী করে মানুষের মতো কথা বলা শিখলাম এবং কী করে আরেকজনের চিন্তা বা মাথায় ঢুকতে পারি এটার হয়তো একদিন বৈজ্ঞানিক ব্যাখা আবিষ্কার হয়ে যাবে। হয়তো ভবিশ্যতে আরো অনেক কিছুরও বৈজ্ঞানিক ব্যাখা আসবে যেমন ধরো জীবের মৃত্যুর পর তার প্রাণের অবস্থা কি হয়। আবার ধরো জ্বিন ভূতের সত্য অস্তিত্ব নিয়েও ব্যাখা আসতে পারে।
কী বলছো আবোলতাবোল। এবার বন্ধ করো অন্ধ জ্ঞান দেয়া।
আচ্ছা, এখন বলো আমায় সাহায্য করবে?
তুমি বাদুড়, আমি তোমার সাহায্য কী করে করবো।
তুমি পারবে। এটা যে কোন মানুষই পারবে। কিন্তু কারে সামনে গিয়ে কথা বলতে গেলেই তারা ভয়ে ভূত ভূত করে। আজব মানুষ!
আচ্ছা বলো।
আচ্ছা, কাল সকালে।
না। আমি সকালে দেখি না।
তাহলে কাল রাত?
না। পারলে আমাকে এখনি দিয়ে এসো।
আমি এতো রাতে কিভাবে যাবো?
ভয় পেয়ো না। আমি আছি।
না। গেইটা তালা মারা, এখন চাবি চাইতে গেলে বাড়িওয়ালা আমার নামে মানহানীর মামলা দিবে।
আচ্ছা, তাহলে কাল রাতেই আসবো। তুমি একটা কার্টুনের বাক্স জোগাড় করে রেখো।
আচ্ছা, যাও তাহলে।
আলী আকবর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। এখনো আরো দুইটা সিগারেট আছে প্যাকেটে। তিনি দুইটটা সিগারেট শেষ করেই শুতে গেলেন।
অফিস থেকে আসার সময় তিনি ফার্মেসি থেকে একটা খালি ঔষুধের বাক্স চেয়ে আনলেন। বাসায় তার দুই মেয়ে দেখেই বললো, বাবা তুমি এই বাক্স কোথা থেকে এনেছো? এটা দিয়ে কী করবে। তিনি বললো, কাজ আছে। তারপর তার স্ত্রী বললেন, তোমার বাবার সব কাজতো উল্টা-পাল্টা কী কাজ করে বাক্স দিয়ে কে জানে।
তিনি একটু রেগে গেলেন। অনেক কষ্টে সেই বচন হজম করে বারান্দায় গিয়ে বসলেন বাদুড়ের অপেক্ষায়। তিনি ডাকছেন, ওঁ পাগলা বাদুড়! পাগল বাদুড়! বাদুড় গ্রিলের সামনে এসে বসে বলছে, চুপ করতো। আমায় পাগল বলে এভাবে ডাকছো। মানুষই তোমাকে পাগল ভাববে।
ভাবুক। চলো তাড়াতাড়ি বাক্সে ঢুকো।
তারপর বাক্স হাতে নিয়ে তিনি সেই কদম গাছের সামনে গেলেন। বাক্স খুলতে ইচ্ছা করছে না। আলী আকবরের মনে চাচ্ছে এই বাদুড়টাকে তিনি খাচায় ভরে পুষবেন। বাক্স খুলতেই দেখলেন বাক্স খালি। তাহলে বাদুড়টা কোথায়? বাক্সে কোন ফুঁটাও তো নেই। সে কোথায় গেলো? কি করে সম্ভব! তিনি অবাক হয়ে গেলেন। শুধু অবাকই না ভয়ে তার বুকের লোমের ফাঁকে ঘাম জমে গেছে। তিনি আশপাশে তাকালেন। তারপর কদম গাছের দিকে তাকালেন। রাতের বেলায় কদম গাছের ডালে কোন বাদুড় বসে থাকলেও দেখা সম্ভব না টর্চ ছাড়া। তার মনে এখনি কয়েকটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে– বাদুড়াটার কি মানুষের মতো কথা বলা এবং অন্যের চিন্তা পড়া ছাড়াও আরেকটাটা ক্ষমতার অধিকারী?
দ্বিতীয় প্রশ্ন — সম্পূর্ণটাই কি তার কল্পনা? বাদুড় কি আসলেই তার সাথে দেখা এবং কথা বলেছিলো। তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না। দুটো প্রশ্নের উত্তরগুলোও তার মাথায় খেলছে না। এমন সময় একজন লোক তার কাধে হাত দিলেন। তিনি পিছনে তাকিয়ে দেখেন, পুলিশের পোষাক পড়া মোটা গোফওয়ালা একজন।
পুলিশ তাকে বলছে, কি ভাই রাতের বেলা এই গাছের চিপায় কী? গাজা টানার জায়গা খুজতাছিলেন। গাড়িতে উঠেন।
কি বলছেন এসব?
গাড়িতে উঠেন ওসি স্যার উঠতে বলছে, চলেন।
এতদিন শুনতাম আপনারা পুলিশরা এমন এমন করেন। বিনা অপরাধে মানুষকে এভাবে ফাঁসান। আজ নিজে প্রত্যক্ষ হওয়ার পর বুঝলাম আপনারা এত জঘন্য। কত টাকা লাগবে বলেন।
পাচঁশ দেন।

যেই আলী আকবর পকেট থেকে যেই মানিব্যাগ বার করতে যাবে তখনই কদমগাছ থেকে এক ঝাঁক বাদুড় এসে পুলিশের মাথায় কামড়ানো শুরু করলো। পুলিশ দৌড়াতে দৌড়াতে কোন চিপায় পালিয়েছে আলী আকবরে তা ভালো মতো দেখতে পায়নি। তিনি খেয়াল করছে, সবগুলো বাদুড় যখন পুলিশটাকে তাড়া করছে তখন শুধু একটা বাদুড় তারা মাথার উপড়ে এলোমেলো ভাবে উড়ছে কিন্তু বাদুড়টা কোন কথা বলছে না।
Googlepluspint

    Copy Sms

  • রহস্য গল্পঃ কদমগাছের বাদুড়

  • Whatsapp
Powered by Blogger.